Headlines

ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রকোপ: তিন আফ্রিকান দেশে ভ্রমণে ভারত সরকারের কড়া সতর্কতা

ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রকোপ: তিন আফ্রিকান দেশে ভ্রমণে ভারত সরকারের কড়া সতর্কতা Photo by Michelangelo Buonarroti on Pexels

আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাসের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান এবং উগান্ডা—এই তিন দেশে ভ্রমণে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব প্রয়োজন না থাকলে ভারতীয় নাগরিকদের এই দেশগুলোতে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইবোলা পরিস্থিতিকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করার পরপরই নয়াদিল্লি এই কড়া নির্দেশিকা জারি করল।

সংকট ও প্রেক্ষাপট: কেন এই জরুরি অবস্থা?

ইবোলা ভাইরাস কোনো নতুন রোগ নয়, তবে বর্তমান সংক্রমণটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক কারণ এটি ‘বুন্ডিবুজিও’ (Bundibugyo) নামক একটি বিরল প্রজাতির মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই নির্দিষ্ট প্রজাতির ভাইরাসের জন্য বর্তমানে কোনো কার্যকর টিকা বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। সাধারণত ইবোলার অন্যান্য প্রজাতির জন্য প্রতিষেধক থাকলেও বুন্ডিবুজিও প্রজাতির ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনও সীমাবদ্ধ। আফ্রিকায় ইতিপূর্বে কয়েকবার এই ভাইরাসের হানা দেখা গেলেও এবারের সংক্রমণের হার এবং বিস্তৃতি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

কঙ্গো এবং উগান্ডায় এর আগে ২০ বারেরও বেশি ইবোলার প্রকোপ দেখা গিয়েছে, কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ডব্লিউএইচও-র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে সংক্রমণের ফলে অন্তত ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৭৫০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি ত্রাণকাজে নিয়োজিত রেড ক্রসের স্বেচ্ছাসেবকরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রমাণ করে।

সংক্রমণের ধরন ও উচ্চ মৃত্যুহার

বিশেষজ্ঞরা এবারের ইবোলা সংক্রমণকে ‘অতি সংক্রামক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইবোলা মূলত একটি প্রাণীবাহিত ভাইরাস যা মানুষের শরীরে থাবা বসায়। এটি অর্থোইবোলাভাইরাস পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যার তিনটি প্রধান ভাগ রয়েছে—ইবোলা ভাইরাস, সুদান ভাইরাস এবং বুন্ডিবুজিও ভাইরাস। বর্তমানে যে প্রজাতিটি ছড়াচ্ছে, তার গড় মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ আক্রান্ত দুইজনের মধ্যে একজনের মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে।

এই ভাইরাসের সংক্রমণের উৎস মূলত ফলখেকো বাদুড় (Fruit Bats)। তবে শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বাঁদর, বুনো হরিণ এবং শজারুর মতো প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শ থেকেও এটি মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। মানুষের মধ্যে এটি রক্ত, বীর্য, বমি বা শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক বা দূষিত পরিবেশ থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, রোগীর মৃত্যুর পরও তার শরীরের তরল থেকে ভাইরাসটি অন্যদের দেহে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ভারত সরকারের কঠোর নির্দেশিকা

ভারত সরকার শুধুমাত্র ভ্রমণেই নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, বরং ওই তিন দেশে বর্তমানে বসবাসকারী ভারতীয়দের জন্যও বিশেষ পরামর্শ জারি করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি এবং বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোতেও নজরদারি বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো সন্দেহভাজন রোগী দেশে প্রবেশ করতে না পারে।

কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘উচ্চ’ থেকে ‘অতি উচ্চ’ ঝুঁকির মাত্রায় উন্নীত করেছে। এর অর্থ হলো, সংক্রমণটি কেবল স্থানীয় নয়, বরং আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কারণেই নমুনা পরীক্ষা এবং দ্রুত রোগী শনাক্তকরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মত ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বুন্ডিবুজিও ভাইরাসের কোনো টিকা না থাকাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সংক্রমিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা এবং শরীরে তরল পদার্থের ভারসাম্য বজায় রাখাই একমাত্র পথ। এর ফলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো ওই অঞ্চলে কাজ করলেও সংক্রমণের উচ্চ হারের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

ভারতের এই সতর্কতা জারি করার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। তবে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এই কঠোর ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা আফ্রিকার ওই দেশগুলোতে খনি বা নির্মাণ কাজে যুক্ত, তাদের সুরক্ষা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বাস্থ্য বিভাগ কীভাবে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বুন্ডিবুজিও প্রজাতির জন্য নতুন কোনো ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু হবে কি না, তাও দেখার বিষয়। আপাতত আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোতে কঠোর স্ক্রিনিং এবং আক্রান্ত দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ সীমিত রাখাই এই মহামারি প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *