মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র মহলে সম্প্রতি তীব্র গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা রণবীর সিংকে ফেডারেশন অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমা এমপ্লয়িজ (FWICE) বয়কট বা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৪৫ কোটি টাকার একটি বিশাল আর্থিক লেনদেনের জটকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা গেছে, যা অভিনেতার আসন্ন বড় বাজেটের ছবি ‘ডন ৩’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সম্প্রতি রণবীরের মুখপাত্র একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে অভিনেতার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে অভিনেতার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
বিতর্কের প্রেক্ষাপট এবং ৪৫ কোটির জট
বলিউডের অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল যে একটি নির্দিষ্ট প্রজেক্টের বকেয়া পাওনা মেটানো নিয়ে রণবীর সিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলের বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। ফেডারেশন অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমা এমপ্লয়িজ বা FWICE সাধারণত চলচ্চিত্র শ্রমিক ও কলাকুশলীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। অভিযোগ উঠেছিল যে একটি বড় চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হওয়ায় এবং প্রায় ৪৫ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতির কারণে সংগঠনটি রণবীরের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চলেছে।
এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রণবীর সিংকে ‘ব্যান’ করার দাবি উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে তাঁর সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সিংহাম এগেইন’-এ তাঁর ‘ধুরন্ধর’ চরিত্রের সাফল্যের মাঝেই এই খবরটি ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। অনেক নেটিজেন মনে করছিলেন যে এর ফলে রণবীরের পেশাগত জীবনে এক বড়সড় ছেদ পড়তে পারে।
মুখপাত্রের বয়ান ও আইনি অবস্থান
গুঞ্জন যখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন রণবীর সিংয়ের জনসংযোগ দল বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলে। অভিনেতার মুখপাত্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে রণবীর সিংকে নিষিদ্ধ করার খবরটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে অভিনেতার সাথে কোনো সংগঠনেরই এমন কোনো বিরোধ নেই যা পেশাদারিত্বকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
মুখপাত্র আরও দাবি করেছেন যে ৪৫ কোটি টাকার যে অঙ্কটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। কোনো আইনি নোটিশ বা ফেডারেশনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা অভিনেতার কাছে পৌঁছায়নি। অভিনেতার টিম এই ধরনের বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং ভক্তদের অনুরোধ করেছে যাতে তারা যাচাই না করে কোনো তথ্যে বিশ্বাস না করেন।
‘ডন ৩’ এবং অন্যান্য প্রজেক্টের ওপর প্রভাব
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ার কথা ছিল ফারহান আখতারের বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘ডন ৩’-এর ওপর। শাহরুখ খানের পর রণবীর সিংকে নতুন ‘ডন’ হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকেই দর্শক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। এমন সময় যদি রণবীরের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি হতো, তবে এই বিশাল বাজেটের ছবির কাজ বিশ বাঁও জলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় তারকাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের আর্থিক বিতর্কের প্রভাব শুধুমাত্র তাঁদের ক্যারিয়ারে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থা এবং বিপণন ব্র্যান্ডগুলোর ওপরও পড়ে। রণবীর বর্তমানে বলিউডের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরদের একজন। ফলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হলে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপনী চুক্তিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
বিশেষজ্ঞদের মত এবং ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম
চলচ্চিত্র সমালোচক এবং ইন্ডাস্ট্রির বিশ্লেষকদের মতে, FWICE বা কোনো সংগঠন চাইলেই একজন প্রথম সারির তারকাকে সরাসরি নিষিদ্ধ করতে পারে না। এর জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের প্রয়োজন হয়। যদি কোনো টেকনিশিয়ান বা কর্মীর পাওনা বকেয়া থাকে, তবেই সংগঠন ‘অসহযোগিতা’ (Non-cooperation) নোটিশ জারি করতে পারে।
তথ্য বলছে, বলিউডে এর আগেও অনেক বড় তারকার বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রযোজক জানিয়েছেন যে রণবীরের মতো পেশাদার অভিনেতার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম, তবে ৪৫ কোটির মতো বড় অঙ্কের দাবি যদি সত্য হয়, তবে তা ইন্ডাস্ট্রির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ
আপাতত রণবীর সিংয়ের মুখপাত্রের বিবৃতির পর ঝড়ের গতি কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো চূড়ান্ত ক্লিনচিট বা বিপরীত কোনো বিবৃতি আসেনি। আগামী কয়েক দিন বলিউডের এই পাওয়ার গেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
এখন দেখার বিষয় হলো, FWICE এই বিষয়ে পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না অথবা রণবীরের পরবর্তী ছবির শুটিং শিডিউলে কোনো পরিবর্তন আসে কি না। ‘ডন ৩’-এর প্রি-প্রোডাকশনের কাজ শুরু হওয়ার কথা খুব শীঘ্রই, তাই এই বিতর্ক দ্রুত মেটানোই হবে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। রণবীর সিংয়ের ইমেজ পুনরুদ্ধার এবং বড় পর্দার প্রজেক্টগুলো নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আইনি স্বচ্ছতা বজায় রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।