পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্প বা টলিউডে রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। গত কয়েক দিনে কলকাতার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই দুই অভিনেতা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, রাজনীতি যদি কোনও শিল্প ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তা শিল্পের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং নেতিবাচক একটি পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে ঋত্বিক চক্রবর্তীর মতে, কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের ছায়াতলে থেকে সৃজনশীল কাজ করা স্বাধীন শিল্পীসত্তার পরিপন্থী।
টলিউড ও রাজনীতির সমীকরণ: একটি সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট
গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিনোদন জগতের সমীকরণও বদলেছে দ্রুতগতিতে। ২০১১ সালের পর থেকে টলিউডের এক বিশাল অংশ সরাসরি শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধী শিবিরেও যোগ দিয়েছেন অনেক পরিচিত মুখ। এর ফলে স্টুডিও পাড়ার অন্দরে ‘ক্যাম্প কালচার’ বা দলাদলি প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতেই কাজ পাওয়া বা না পাওয়া নির্ধারিত হচ্ছে, যা আগে কখনও এই মাত্রায় দেখা যায়নি।
ঋত্বিক চক্রবর্তীর কড়া অবস্থান
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী সবসময়ই সোজাসাপ্টা কথা বলার জন্য পরিচিত। তিনি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “রাজনীতি যদি কোনও ইন্ডাস্ট্রিকে কন্ট্রোল করে, সেটা ভালো তো নয়ই, অস্বাভাবিকও বটে।” তাঁর মতে, একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রাথমিক পরিচয় হওয়া উচিত তাঁর কাজ, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়। তিনি মনে করেন, যখন রাজনীতি কোনও শিল্পের কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সৃজনশীলতা গৌণ হয়ে পড়ে এবং আনুগত্যই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। এটি কেবল চলচ্চিত্রের গুণমানই নষ্ট করে না, বরং নতুন প্রতিভাদের উঠে আসার পথেও অন্তরায় সৃষ্টি করে।
জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপসহীন সুর
অন্যদিকে, ছোট ও বড় পর্দার পরিচিত অভিনেতা জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, শিল্পীদের কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পতাকার তলায় থাকা উচিত নয়। জয়জিতের মতে, একজন শিল্পী সবার জন্য কাজ করেন এবং তাঁর একটি নিরপেক্ষ অবস্থান থাকা জরুরি। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে ইন্ডাস্ট্রির পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যখন স্টুডিওর ফ্লোরে কাজের চেয়ে রাজনৈতিক আলোচনা বেশি গুরুত্ব পায়, তখন শিল্পের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাঁর এই মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত ও ইন্ডাস্ট্রির তথ্য
চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, টলিউডে এই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে টলিউডের শীর্ষস্থানীয় অন্তত ৪০ শতাংশ শিল্পী সরাসরি কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, সরকারি অনুদান বা হল পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগ একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবীণ পরিচালকদের একাংশ মনে করেন, সত্যজিৎ রায় বা মৃণাল সেনের যুগেও রাজনৈতিক সিনেমা তৈরি হয়েছে, কিন্তু শিল্পী হিসেবে তাঁরা কখনও কোনও দলের আজ্ঞাবহ ছিলেন না। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করছে বলে তাঁদের ধারণা।
সৃজনশীলতায় বাধার প্রাচীর
রাজনীতির এই খবরদারির ফলে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বাধীন বা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ সিনেমা। যে সমস্ত পরিচালক বা অভিনেতা কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের ছবি ডিস্ট্রিবিউশন বা প্রচারের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ঋত্বিক চক্রবর্তীর মতো অভিনেতারা যখন এই বিষয়ে সরব হন, তখন তা ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক টেকনিশিয়ান এবং পার্শ্ব অভিনেতাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট ইউনিয়ন বা রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না হলে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও করণীয়
এই পরিস্থিতির প্রভাব কেবল ইন্ডাস্ট্রির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দর্শকদের রুচি এবং সিনেমা দেখার অভ্যাসের ওপরও পড়ছে। দর্শক যখন দেখেন তাঁদের প্রিয় অভিনেতা কেবল রাজনৈতিক প্রচারেই ব্যস্ত, তখন পর্দার চরিত্রের প্রতি তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলা সিনেমার বাজারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শিল্পীদের এই রাজনৈতিক মেরুকরণ বন্ধ না হলে টলিউড বিশ্ব দরবারে তার স্বতন্ত্র পরিচয় হারাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী দিনগুলোতে টলিউডের এই অভ্যন্তরীণ সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ঋত্বিক এবং জয়জিতের মতো জনপ্রিয় মুখরা যখন প্রকাশ্যে এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ করছেন, তখন সাধারণ শিল্পী এবং কলাকুশলীদের মধ্যেও প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো কি বিনোদন জগতের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণের রাশ আলগা করবে, নাকি এই ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতিই টলিউডের নতুন নিয়মে পরিণত হবে, তার উত্তর দেবে সময়। আপাতত স্টুডিও পাড়ায় এই নিয়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।