Headlines

ইবোলা মোকাবিলায় বড় সাফল্য: তিন মাসের মধ্যে আসছে অক্সফোর্ড ও সিরাম ইনস্টিটিউটের টিকা

ইবোলা মোকাবিলায় বড় সাফল্য: তিন মাসের মধ্যে আসছে অক্সফোর্ড ও সিরাম ইনস্টিটিউটের টিকা Photo by Max Mishin on Pexels

আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাসের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ রুখতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া যৌথভাবে একটি নতুন টিকা তৈরি করছে, যা আগামী তিন মাসের মধ্যেই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। কঙ্গো, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানে ইবোলা ভাইরাসের অত্যন্ত সংক্রামক ‘বুন্ডিবুজিও’ (Bundibugyo) প্রজাতির সংক্রমণের কারণে ইতিমধ্যে ২২০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হওয়ায় এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই নির্দিষ্ট প্রজাতির সংক্রমণের বিরুদ্ধে কোনো অনুমোদিত টিকা বা ওষুধ না থাকায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

আফ্রিকায় ইবোলা পরিস্থিতি ও টিকার প্রয়োজনীয়তা

দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদান ইবোলা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত। বিশেষ করে বুন্ডিবুজিও প্রজাতির ভাইরাসটি বর্তমানে অতি সংক্রামক হয়ে উঠেছে, যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়েছে এবং দ্রুত নমুনা পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ইবোলা ভাইরাসের অন্যান্য প্রজাতির জন্য টিকা থাকলেও বুন্ডিবুজিও প্রজাতির জন্য কোনো কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা এতদিন ছিল না। এই শূন্যতা পূরণ করতেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দ্রুতগতিতে গবেষণার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। পশুর ওপর প্রাথমিক ট্রায়াল সফল হওয়ার পর এখন মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

অক্সফোর্ড ও সিরাম ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগ

এই জীবনদায়ী টিকা তৈরির লড়াইয়ে অক্সফোর্ডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম টিকা উৎপাদনকারী সংস্থা ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (SII)। সিরাম ইনস্টিটিউট মূলত টিকার ব্যাপক উৎপাদন এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। এই সহযোগিতার ফলে টিকার উৎপাদন প্রক্রিয়া যেমন দ্রুত হবে, তেমনি এটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোও সহজ হবে।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের টিকা প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান টেরেসা এল জানিয়েছেন, সিরাম ইনস্টিটিউটের অংশগ্রহণ এই প্রকল্পের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আরও জানান, এই টিকাটি মূলত একটি নির্দিষ্ট ডোজের (Single Dose) হবে, যা দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইবোলা জায়রে টিকার আদলেই এটি তৈরি করা হচ্ছে।

ChAdOx প্রযুক্তি ও টিকার কার্যকারিতা

নতুন এই টিকাটি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অক্সফোর্ডের বিখ্যাত ‘ChAdOx’ প্রযুক্তি। উল্লেখ্য, এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোভিডের সময় অ্যাস্ট্রাজেনেকা বা কোভিশিল্ড টিকা তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দ্রুত প্রস্তুত করে তোলে।

গবেষকদের মতে, একটি মাত্র ডোজ ইবোলা বুন্ডিবুজিও মোকাবিলায় সক্ষম হবে কি না, তা নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পশুর ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক ডোজেই শরীরে শক্তিশালী অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া শরীরের T-cell বা টি-কোষগুলোকেও এই টিকা সক্রিয় করে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা প্রদান করে।

ট্রায়াল ও বিশেষজ্ঞ মতামত

আগামী তিন মাসের মধ্যে এই টিকাটি মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য নিয়ে আসা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী এবং যারা ইতিমধ্যে আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের ওপর এই ট্রায়াল চালানো হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অ্যান্টিবডি এবং T-cell এই দুটির সম্মিলিত শক্তি শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের গবেষকরা জানিয়েছেন, সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি ট্রায়ালে এটি নিরাপদ এবং কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবেই এটি বড় আকারে ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হবে। সিরাম ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা প্রস্তুত রেখেছে যাতে অনুমোদন পাওয়ার সাথে সাথেই টিকা সরবরাহ শুরু করা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

ইবোলা সংক্রমণের এই ভয়াবহতা দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, শুধুমাত্র টিকা নয়, বরং কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং দ্রুত শনাক্তকরণও এই মহামারি রুখতে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আক্রান্ত দেশগুলোতে নমুনা পরীক্ষার হার বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অক্সফোর্ড এবং সিরাম ইনস্টিটিউটের এই উদ্যোগ সফল হলে এটি কেবল আফ্রিকার জন্য নয়, বরং বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় মাইলফলক হবে। এই টিকাটি সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের।

আগামী কয়েক সপ্তাহ গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক ফলাফলই নির্ধারণ করবে টিকার ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে অক্সফোর্ডের ল্যাবরেটরি এবং সিরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদন কেন্দ্রের দিকে, যেখানে ইবোলা মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন বোনা হচ্ছে। পরবর্তী মাসগুলোতে এই টিকার কার্যকারিতা এবং বিতরণের রোডম্যাপ নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *