শেষ শ্রদ্ধা ও অন্তিম বিদায়
বাংলার চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর স্রষ্টা পরিচালক অনীক দত্ত শুক্রবার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পঞ্চভূতে বিলীন হলেন। বুধবার হিন্দুস্তান পার্কে নিজের বাসভবন থেকে পড়ে গিয়ে অকালপ্রয়াত হন এই প্রখ্যাত পরিচালক। শুক্রবার সকালে পিস ওয়ার্ল্ড থেকে তাঁর মরদেহ প্রথমে নন্দন এবং পরে এনটি ওয়ান স্টুডিওতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অগণিত অনুরাগী ও সহকর্মী তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নন্দনে শেষ বিদায়
পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের তৈরি নন্দন প্রাঙ্গণ ছিল অনীক দত্তর কাছে অত্যন্ত আবেগের জায়গা। তাঁর পরিচালিত ‘অপরাজিত’ ছবিটি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ তৈরির নেপথ্যকাহিনি নিয়ে নির্মিত হলেও, সেই সময়ে নন্দনে প্রদর্শিত না হওয়ায় তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। সেই নন্দনেই শেষবারের মতো শায়িত ছিলেন পরিচালক, যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্টরা তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এনটি ওয়ান স্টুডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর
নন্দন থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় টালিগঞ্জের এনটি ওয়ান স্টুডিওতে, যা পরিচালকের কর্মজীবনের অন্যতম সাক্ষী। সেখানে শেষ বিদায়বেলায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। বাবার প্রিয় গান গাইতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিচালকের কন্যা ঐশী। এই শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন জিৎ, জিতু কমল এবং রুদ্রনীল সেনগুপ্তের মতো শিল্পীরা। তবে অনীক দত্তর দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের অনেক সহকর্মী ও তারকাদের অনুপস্থিতি নিয়ে শোকের আবহেও প্রশ্ন উঠেছে জনমহলে।
প্রয়াণের নেপথ্যে ও পরবর্তী পদক্ষেপ
পরিচালকের অকাল প্রয়াণের কারণ হিসেবে ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটটি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মেয়ে সুইডেনে থাকায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লেগেছে, তবে শুক্রবার বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
চলচ্চিত্র জগতে অনীকের অবদান
অনীক দত্ত কেবল একজন পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ধারালো রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলা সিনেমায় নতুন এক ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, যা বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক—উভয় দিক থেকেই সমাদৃত হয়েছিল। তাঁর প্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্রের এক সৃজনশীল যুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।
ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি
পরিচালকের আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। অনীক দত্তর রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলি এবং তাঁর চিন্তাধারার প্রভাব আগামী প্রজন্মের নির্মাতারা কীভাবে ধারণ করবেন, তা এখন দেখার বিষয়। এছাড়া, তাঁর মৃত্যুর তদন্তে পুলিশি রিপোর্ট এবং সুইসাইড নোটের ফরেন্সিক বিশ্লেষণ আগামী দিনে কোন নতুন তথ্য সামনে আনে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে চলচ্চিত্র মহল।