কলকাতা পুরসভা সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্থা ও তাঁর আত্মীয়দের একাধিক সম্পত্তিতে নোটিস পাঠিয়েছে, যা দলের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই নোটিসকাণ্ডের পর দলের শীর্ষ নেতাদের একাংশ অভিষেকের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। মেয়র ফিরহাদ হাকিম থেকে শুরু করে কুণাল ঘোষ—অনেকেই এই বিষয়ে দায় এড়িয়ে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা শাসক শিবিরের অন্দরে অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধীদের দীর্ঘমেয়াদী অভিযোগ ও প্রেক্ষাপট
রাজ্যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তির বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরেই বিরোধীদের নিশানায় ছিল। বিশেষ করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বারবার ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সহ অভিষেকের পরিবারের নামে থাকা একাধিক সম্পত্তির তালিকা জনসমক্ষে এনেছেন। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি অনুযায়ী, লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের ১৪টি, অভিষেকের নামে ৪টি এবং তাঁর বাবার নামে ৬টি—মোট ২৪টি প্রপার্টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং এবং অ্যাসেসমেন্ট বিভাগ সক্রিয় হয়ে ওঠায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
নোটিসকাণ্ডের বিস্তারিত ও পুরসভার ভূমিকা
কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ এবং অ্যাসেসমেন্ট বিভাগ থেকে মোট ১৭টি নোটিস পাঠানো হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্থা ও তাঁর আত্মীয়দের ঠিকানায়। এই নোটিসগুলোর মধ্যে কোনোটির বিরুদ্ধে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ আনা হয়েছে, আবার কোনোটির ক্ষেত্রে সম্পত্তির চরিত্র বদলের বিষয়ে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ১৭টি নোটিসের মধ্যে ১৪টিই গেছে পুরসভার ৯ নম্বর বরো এলাকা থেকে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে কেন হঠাৎ করে এই সময়েই পুরসভা এত কঠোর অবস্থান নিল।
নেতৃত্বের দায় এড়িয়ে চলার প্রবণতা ও ফিরহাদ হাকিমের মন্তব্য
এই নোটিসকাণ্ড নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিম কার্যত হাত তুলে নিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টের রুটিন নোটিসের বিষয়ে মেয়রকে জানানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে তাঁর গলায় ক্ষোভের সুরও শোনা গিয়েছে যখন তিনি বলেন, “ওঁর ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি কথা বলতে পারব না, কারণ আমি কোনো ইজারা নিইনি।” মেয়রের এই মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতার বিষয়ে এমন ‘নিস্পৃহ’ অবস্থান আগে দেখা যায়নি।
দেবলীনা বিশ্বাসের ইস্তফা ও প্রশাসনিক চাপ
নোটিস বিতর্কের মাঝেই ৯ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সন পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন তৃণমূল কাউন্সিলর দেবলীনা বিশ্বাস। তাঁর ইস্তফা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে উঠলে তিনি জানান যে, কোনো কিছু ধামাচাপা দেওয়ার এক্তিয়ার তাঁর নেই। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোনো বিষয়ের দায় কেন তাঁর ওপর চাপানো হবে যেখানে সেটি তাঁর এক্তিয়ারের বাইরে। তাঁর এই মন্তব্য দলের অন্দরে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং চাপের রাজনীতির দিকেই আঙুল তুলছে।
দলের অন্দরে ফাটলের ইঙ্গিত ও অন্যান্য নেতাদের প্রতিক্রিয়া
তৃণমূলের অন্দরে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত নেতাদেরও এখন দূরত্ব বজায় রাখতে দেখা যাচ্ছে। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, যার নাম এই নোটিসে জড়িয়েছে, তিনিই এর উত্তর দেওয়ার সঠিক ব্যক্তি। একইভাবে প্রবীণ নেতা ও বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও বিষয়টিকে ব্যক্তিগত হিসেবেই দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই বিষয়ে তাঁর কিছু জানার কথা নয়। নেতাদের এই সমবেত ‘অজ্ঞতা’ বা দায় এড়ানোর চেষ্টা দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত
বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী, তৃণমূলের অন্দরে ‘মমতা-ময়’ যে পরিবেশ ছিল, সেখানে এখন ফাটল স্পষ্ট। বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের মতে, তৃণমূল নেতারা এখন অভিষেকের নাম নিতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন এবং ‘সর্বনাম’ ব্যবহার করে কথা বলছেন। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দলের পুরনো এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ সম্ভবত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী দিনে এই নোটিসকাণ্ডের আইনি পরিণতি কী হয় এবং দলগতভাবে তৃণমূল এই অস্বস্তি কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পুরসভার এই পদক্ষেপ যদি স্রেফ প্রশাসনিক হয়, তবে তা দলের স্বচ্ছতা প্রমাণ করবে, কিন্তু রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকলে তা আগামী নির্বাচনে দলের সংহতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।