পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার রাজধানী দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে মিলিত হলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন, আর্থিক পরিস্থিতি এবং শিল্পায়নের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠনের পর এই সফরকে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দিল্লিতে উচ্চপর্যায়ের কর্মব্যস্ততা ও সৌজন্য সাক্ষাৎ
দুই দিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার রাতেই দিল্লি পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিমানবন্দরে অবতরণের পর তিনি সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বাসভবনে যান এবং সেখানে প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন। সূত্রের খবর, এই বৈঠকে রাজ্যের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোট পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে মুখ্যমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তিনি বিজেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ভবন ও উপ-রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে গিয়েও সৌজন্য সাক্ষাৎ সারেন মুখ্যমন্ত্রী।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে কেন্দ্রের আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর এই একান্ত বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে পুষ্পস্তবক এবং ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দেমাতরম’ খচিত একটি ছবি উপহার দেন। বৈঠকের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভঙ্গুর আর্থিক দশা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা এবং রাজ্যে বড়মাপের বিনিয়োগ আনা।
বৈঠক শেষে শুভেন্দু অধিকারী সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান যে, প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ দর্শনের ভিত্তিতে রাজ্যের উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতি কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারের বিষয়। শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে রাজ্যকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে কেন্দ্র সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
প্রেক্ষাপট: ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের লক্ষ্যমাত্রা
নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপি নেতৃত্ব বারবার ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। বিজেপি তাদের ‘সংকল্প পত্রে’ পশ্চিমবঙ্গকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। রাজ্যের বিশাল পরিমাণ ঋণ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা এখন নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের ফলে অনেক কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্যে থমকে ছিল। শুভেন্দু অধিকারীর এই সফরের মাধ্যমে সেই অচলাবস্থা কাটবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বৈঠক ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রশাসনিক তৎপরতা
এই সফরের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী কেবল সৌজন্য বিনিময় করেননি, বরং রাজ্যের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর এটা স্পষ্ট যে, রাজ্যে একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়াই এখন প্রধান লক্ষ্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) এবং আইটি সেক্টরে বিনিয়োগ টানার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের ঘনঘন রাজ্য সফর এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন, এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ফলস্বরূপ রাজ্যে ঠিক কী কী পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র কোনো বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
দিল্লি সফর শেষে আজই কলকাতায় ফিরছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফিরে আসার পর এই বৈঠকের নির্যাস নিয়ে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রের আশ্বাস বাস্তবে রূপান্তরিত হলে পশ্চিমবঙ্গের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।