Headlines

আইএসএল চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল: দুই দশকের খরা কাটিয়ে লাল-হলুদের ঐতিহাসিক জয় ও কোটি টাকার পুরস্কার

আইএসএল চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল: দুই দশকের খরা কাটিয়ে লাল-হলুদের ঐতিহাসিক জয় ও কোটি টাকার পুরস্কার Photo by César O'neill on Pexels

দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইন্ডিয়ান সুপার লিগের (আইএসএল) শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করল ইস্টবেঙ্গল এফসি। গত রবিবার রাতে এক টানটান উত্তেজনার ম্যাচে জয়লাভ করে লাল-হলুদ ব্রিগেড ভারতের ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে। কোচ অস্কার ব্রুজোঁর জাদুকরী প্রশিক্ষণে ক্লাবটি কেবল ট্রফিই জেতেনি, বরং বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কারও নিশ্চিত করেছে, যা ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক জয়ের প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ প্রতিক্ষা

ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্য এই জয় ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী মরুভূমিতে বৃষ্টির মতো। ২০০৩ সালের আসিয়ান কাপ এবং ২০০২ সালের জাতীয় লিগ জয়ের পর থেকে বড় কোনো লিগ শিরোপা লাল-হলুদ তাঁবুতে আসেনি। বিগত কয়েক মরশুম ধরে আইএসএলে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং পয়েন্ট তালিকার তলানিতে থাকার গ্লানি মুছে ফেলে এই জয় ক্লাবটির আভিজাত্যকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করল।

মরশুমের শুরুতে দল গঠনে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও, কোচ অস্কার ব্রুজোঁ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলের খেলার ধরনে আমূল পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে মাঝমাঠ এবং রক্ষণভাগের সংহতি দলকে অপরাজেয় করে তোলে। এই জয়ের ফলে ইস্টবেঙ্গল কেবল চ্যাম্পিয়ন তকমা পায়নি, বরং এশিয়ার মঞ্চে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করার পথে অনেকটা এগিয়ে গেল।

পুরস্কারের অঙ্ক ও আর্থিক সমৃদ্ধি

আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে ইস্টবেঙ্গল এফসি বিশাল অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার লাভ করেছে। তথ্য অনুযায়ী, লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য ক্লাবটি প্রায় ৬ কোটি টাকা পুরস্কার মূল্য হিসেবে পেয়েছে। রানার্স-আপ দল পেয়েছে ৩ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন গ্লাভস এবং সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়দের জন্যও ছিল আলাদা আর্থিক বরাদ্দ।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্লাবের ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার যে কালো মেঘ ক্লাবের ওপর ছিল, এই সাফল্য তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। এই অর্থ আগামী মরশুমের জন্য আরও উন্নতমানের বিদেশি খেলোয়াড় নিয়োগ এবং যুব একাডেমি সংস্কারে ব্যয় করা হতে পারে।

মাঠের লড়াই ও তারকাদের পারফরম্যান্স

পুরো মরশুম জুড়ে ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের মূল কারিগর ছিলেন তাদের বিদেশি ও দেশি খেলোয়াড়দের রসায়ন। মাদিহ তালাল, ক্লেইটন সিলভা এবং সাউল ক্রেসপোদের মতো খেলোয়াড়রা মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে গোলরক্ষক প্রভসুখন গিলের অসাধারণ সেভগুলো অনেক ম্যাচে পয়েন্ট নিশ্চিত করেছে।

তবে সাফল্যের মাঝেই কিছুটা বিষাদের সুর বেজেছে দলবদলের বাজারে। দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এজেজারি এবং মিগুয়েল লবো অনিশ্চয়তা নিয়ে শহর ছাড়ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের চুক্তি নবীকরণ নিয়ে ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় সমর্থকরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। মরশুম জুড়ে তাদের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো, যা দলকে শিরোপার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে।

কোচ অস্কার ব্রুজোঁ এবং সমর্থকদের আবদার

ইস্টবেঙ্গল জনতার এখন একটাই স্লোগান— “স্টে অস্কার”। কোচ অস্কার ব্রুজোঁ যেভাবে দলের মধ্যে হার না মানা মানসিকতা তৈরি করেছেন, তাতে তিনি সমর্থকদের নয়নমণি হয়ে উঠেছেন। তার রণকৌশল এবং খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নই এই ২২ বছরের খরা কাটাতে সাহায্য করেছে। ফুটবল মহলের মতে, অস্কারের আক্রমণাত্মক অথচ সুশৃঙ্খল ফুটবল শৈলীই ইস্টবেঙ্গলকে অন্যান্য দলের থেকে আলাদা করেছে।

সাফল্যের খতিয়ান বলছে, মরশুমের দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টবেঙ্গল সবথেকে বেশি পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাদের গোল করার হার গত মরশুমের তুলনায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রক্ষণে জমাটবদ্ধতা এবং কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলে অস্কারের দল প্রতিপক্ষকে বারবার নাস্তানাবুদ করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রভাব

এই জয় কেবল একটি ট্রফি নয়, বরং ভারতীয় ফুটবলের মানচিত্রে ইস্টবেঙ্গলের পুনরুত্থানের সংকেত। এই সাফল্যের ফলে ক্লাবের ব্র্যান্ড ভ্যালু উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা নতুন স্পনসরদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে। এছাড়া আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এশিয়ার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ ক্লাবের আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেবে।

আগামী দিনগুলোতে ম্যানেজমেন্টের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে দলের কোর গ্রুপকে ধরে রাখা। বিশেষ করে অস্কার ব্রুজোঁর চুক্তি বৃদ্ধি এবং এজেজারি বা মিগুয়েলের বিকল্প খুঁজে বের করা হবে তাদের প্রথম কাজ। সমর্থকরা এখন থেকেই আগামী মরশুমের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, যেখানে ইস্টবেঙ্গল কেবল ভারত নয়, এশিয়ার মঞ্চেও আধিপত্য বিস্তার করবে। নজর থাকবে ক্লাব কীভাবে এই আর্থিক পুরস্কারকে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের সোপান হিসেবে ব্যবহার করে তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *