Headlines

কলকাতা পুরসভায় নজিরবিহীন সংঘাত: অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকায় ক্লাব রুমে হাউস বসালেন তৃণমূল কাউন্সিলররা

কলকাতা পুরসভায় নজিরবিহীন সংঘাত: অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকায় ক্লাব রুমে হাউস বসালেন তৃণমূল কাউন্সিলররা Photo by Rahul Pandit on Pexels

কলকাতা পুরসভার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন এবং বিতর্কিত ঘটনার সাক্ষী থাকল শহর। নির্ধারিত অধিবেশন কক্ষ তালাবন্ধ থাকায় সোমবার কাউন্সিলরদের ক্লাব রুমেই বিকল্প হাউস বসালেন তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলররা। মেয়র ফিরহাদ হাকিম এই ঘটনাকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি “চরম অপমান” বলে অভিহিত করেছেন। মূলত পুর কমিশনার ও মেয়রের মধ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সমন্বয়হীনতার জেরেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক জটিলতা ও পটভূমি

কলকাতা পুরসভার কাজ পরিচালনায় সাধারণত মেয়র পরিষদ এবং প্রশাসনিক আমলাদের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। তবে সাম্প্রতিককালে পুর কমিশনার এবং মেয়রের মধ্যে মতপার্থক্য তুঙ্গে উঠেছে। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন পুরসভার সেক্রেটারি একটি নোটিশের মাধ্যমে জানান যে, নির্ধারিত অধিবেশনটি স্থগিত করা হয়েছে। এর পরপরই সেই সেক্রেটারিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন একজন দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তৃণমূল পরিচালিত এই পুরবোর্ডের দাবি, অধিবেশন ডাকার বা স্থগিত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে চেয়ারপার্সনের হাতে। চেয়ারপার্সন মালা রায় অধিবেশন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও মূল অধিবেশন কক্ষটি খোলা হয়নি। এর প্রতিবাদে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে তৃণমূল কাউন্সিলররা কাউন্সিলর ক্লাব রুমেই তাদের আলোচনা ও অধিবেশন সম্পন্ন করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরসভার অন্দরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ফিরহাদ হাকিমের প্রতিক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন

মেয়র ফিরহাদ হাকিম এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “আজ যেটা হয়েছে তা সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য চরম অবমাননাকর। হুট করে আমার ইচ্ছা হলো আর আমি হাউস বন্ধ করে দিলাম—এমনটা চলতে পারে না। অ্যাক্ট অনুযায়ী চেয়ারপার্সনের নির্দেশই চূড়ান্ত হওয়া উচিত।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, যারা এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন, তারা গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন। মেয়রের মতে, প্রশাসনিক স্তরে বাধা দিয়ে তৃণমূল পরিচালিত এই বৈধ পুরবোর্ডকে কাজ করতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সংঘাত কেবল প্রশাসনিক নয়, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণও বিদ্যমান।

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ ও আইনি বৈধতা

অন্যদিকে, বিজেপির কাউন্সিলররা এই বিকল্প অধিবেশনকে সম্পূর্ণ “বেআইনি” বলে দাবি করেছেন। সজল ঘোষ, মীনাদেবী পুরোহিত এবং সন্তোষ পাঠকের মতো বিরোধী কাউন্সিলররা পুর কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে যান। তাদের দাবি, যেহেতু সচিব আগে থেকেই অধিবেশন স্থগিতের নোটিশ দিয়েছিলেন, তাই ক্লাব রুমে বসে আলোচনা করার কোনো সাংবিধানিক বা আইনি বৈধতা নেই।

বিজেপি কাউন্সিলরদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষ এই ধরণের বিশৃঙ্খলার শিকার হচ্ছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোন আইনবলে অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও অন্য জায়গায় হাউস চালানো হলো। কমিশনারের অনুপস্থিতিতে তারা নতুন সচিবের কাছে তাদের আপত্তির কথা জানান এবং এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার হুঁশিয়ারি দেন।

বিশেষজ্ঞ মত ও প্রশাসনিক প্রভাব

পুর আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, মেয়রের প্রশাসনিক ক্ষমতার পাশাপাশি কমিশনারের কিছু নির্দিষ্ট এক্সিকিউটিভ ক্ষমতা থাকে। তবে অধিবেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে চেয়ারপার্সনের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তথ্য বলছে, এর আগে কলকাতা পুরসভায় এমন পরিস্থিতি কখনও তৈরি হয়নি যেখানে নির্বাচিত সদস্যদের জন্য মূল কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এই ধরণের সংঘাতের ফলে নাগরিক পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। নিকাশি ব্যবস্থা, রাস্তা সংস্কার বা কর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এই অধিবেশনে অনুমোদিত হওয়ার কথা থাকে। প্রশাসনিক এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে কলকাতার উন্নয়নমূলক কাজ থমকে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য প্রভাব

এই নজিরবিহীন ঘটনার পর এখন সবার নজর নবান্ন এবং পুর কমিশনারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। রাজ্য সরকার এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হস্তক্ষেপ করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তৃণমূল কাউন্সিলররা এই লড়াইকে রাজপথে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে বিজেপি এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আগামী দিনগুলোতে পুরসভার সচিবালয় এবং মেয়র পরিষদের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংঘাত মেটাতে রাজ্য পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর কোনো বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। আপাতত কলকাতা পুরসভার এই অস্থির পরিবেশ শহরের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *