Headlines

পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’: নতুন সরকারের কঠোর পদক্ষেপে আশাবাদী সাধারণ মানুষ

পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স': নতুন সরকারের কঠোর পদক্ষেপে আশাবাদী সাধারণ মানুষ Photo by Monojit Dutta on Pexels

গত ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক বড়সড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্য সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে একের পর এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনছে। কলকাতা থেকে জেলা—পুর নিয়োগ দুর্নীতি, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট রাজ রুখতে গত দুই সপ্তাহে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর (ইডি) সাঁড়াশি অভিযানে প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু ও প্রাক্তন পুলিশকর্তা শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের মতো হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মূলত দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলায়তন ভাঙতে এবং সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

দুর্নীতির শিকড় উপড়াতে সরকারের ‘অ্যাকশন মোড’

দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গে নিয়োগ দুর্নীতি, বেআইনি নির্মাণ এবং তোলাবাজির মতো অভিযোগগুলো জনমানসে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে রেয়াত করা হবে না। এই বার্তার বাস্তবায়ন দেখা গেছে গত ১৪ দিনের কার্যকলাপে। কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং রাজ্য পুলিশের যৌথ তৎপরতায় একের পর এক দুর্নীতির ফাইল খোলা হচ্ছে। বিশেষ করে পুর নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় প্রাক্তন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসুর গ্রেফতারি এই অভিযানের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দাবি, পুরসভাগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে এবং অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। সুজিত বসুর পাশাপাশি ইডির নজরে রয়েছেন প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী রথীন ঘোষ, দক্ষিণ দমদম পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান পাচু রায় এবং ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই দত্ত। এদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে নথিপত্র তলব করা হয়েছে।

তদন্ত কমিশন ও বিচারবিভাগীয় তৎপরতা

কেবল গ্রেফতারি নয়, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান খুঁজতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে এই কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্যের সিনিয়র আইপিএস অফিসার কে জয়রামনকে। এই কমিশন মূলত গত কয়েক বছরে হওয়া নিয়োগ এবং প্রশাসনিক আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখবে।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল প্রশাসনিক তদন্ত নয়, বরং একটি বিচারবিভাগীয় তদারকির ছায়ায় তদন্ত প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ ওঠার সুযোগ কম থাকে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। কমিশনকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের অবসান

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও আবাসন প্রকল্পে ‘সিন্ডিকেট’ এবং ‘কাটমানি’ কালচার একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তোলাবাজির অভিযোগে সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত প্রাক্তন পুলিশকর্তা শান্তনু সিনহা বিশ্বাস ও সোনা পাপ্পুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের এই সক্রিয়তা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে এবং তোলাবাজি বন্ধ করতে প্রতিটি জেলায় বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হবে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এই পদক্ষেপগুলো নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অতীতে চাকরির সুযোগ পাননি বা যারা সিন্ডিকেট রাজের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তারা নতুন করে আশার আলো দেখছেন। কলকাতার রাজপথে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা চান এই তদন্ত যেন মাঝপথে থেমে না যায় এবং প্রকৃত দোষীরা যেন শাস্তি পায়।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্র্যাকডাউন যেমন সরকারের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ে তুলছে, তেমনি এটি একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও বটে। প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে গেঁথে থাকা দুর্নীতির জাল উপড়ে ফেলা সহজ কাজ নয়। প্রাক্তন আমলাদের মতে, জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হলে নিচুতলার কর্মীদের মধ্যেও সততার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। কেবল উপরের স্তরে গ্রেফতারি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

তথ্য বলছে, গত এক দশকে রাজ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সেই বিশাল পরিমাণ অর্থের হদিশ পাওয়া এবং তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। তবে ইডি এবং সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর সাথে রাজ্য পুলিশের এই সমন্বয় নতুন সরকারের প্রশাসনিক দৃঢ়তারই পরিচয় দিচ্ছে।

আগামী দিনে যা ঘটতে পারে

রাজ্য সরকারের এই কঠোর অবস্থান আগামী দিনে আরও বড় কোনো গ্রেফতারির ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। বিশেষ করে তদন্ত কমিশন যখন তাদের কাজ শুরু করবে, তখন আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নজর থাকবে কলকাতা হাইকোর্টের পরবর্তী নির্দেশগুলোর দিকেও, কারণ অনেকগুলো মামলাই এখন আদালতের বিচারাধীন।

সামনের দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো কি দুর্নীতির ‘রাঘববোয়াল’দের নাগাল পাবে? নাকি আইনি লড়াইয়ের মারপ্যাঁচে তদন্তের গতি শ্লথ হয়ে যাবে? সাধারণ মানুষ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়। তবে আপাতত সরকারের এই ‘অ্যাকশন মোড’ রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার অগ্নিপরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *