Headlines

প্রোমোটার-পুলিশ-রাজনীতিক আঁতাত: কলকাতায় ‘পিপিপি’ মডেল দুর্নীতির শিকড় খুঁজছে ইডি

প্রোমোটার-পুলিশ-রাজনীতিক আঁতাত: কলকাতায় 'পিপিপি' মডেল দুর্নীতির শিকড় খুঁজছে ইডি Photo by 112 Uttar Pradesh on Pexels

কলকাতায় প্রোমোটার, পুলিশ এবং রাজনীতিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী দুর্নীতির চক্র বা ‘পিপিপি’ (PPP) মডেলের পর্দাফাঁস করতে শুক্রবার শহর ও শহরতলির ৯টি স্থানে ম্যারাথন তল্লাশি চালিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসিপি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস এবং ব্যবসায়ী জয় এস কামদারের যোগসূত্র ধরে এই অভিযানে উঠে এসেছে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা, জমি দখল ও তোলাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি মূলত খতিয়ে দেখছে কীভাবে প্রশাসনের রক্ষকরাই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করে আসছিল।

দুর্নীতির প্রেক্ষাপট ও ‘সোনা পাপ্পু’ সংযোগ

এই বিশাল দুর্নীতির জালটি প্রথম সামনে আসে ‘সোনা পাপ্পু’ মামলার সূত্র ধরে। বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পু ছিল এই চক্রের অন্যতম প্রধান মুখ, যে মূলত মাঠ পর্যায়ে হুমকি ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার কাজ করত। গত ১৫ মে আদালতে জমা দেওয়া ইডির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, জমি দখলের জন্য প্রোমোটার, পুলিশ এবং অপরাধীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন ধৃত ব্যবসায়ী জয় এস কামদার এবং পুলিশ আধিকারিক শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। এই সিন্ডিকেটে কলকাতা পুলিশের বেশ কয়েকজন নিচুতলার কর্মী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্তাদেরও যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

ম্যারাথন তল্লাশি ও গুরুত্বপূর্ণ নথির হদিস

শুক্রবার সকাল থেকেই ইডির পৃথক পৃথক দল শহরের বিভিন্ন প্রান্তে হানা দেয়। দক্ষিণ কলকাতার ফার্ন রোডে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের এক আত্মীয়ের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। একইসঙ্গে মুর্শিদাবাদের কান্দিতে শান্তনুর পৈতৃক ভিটেতেও অভিযান চলে। কসবার এন কে ঘোষাল রোডে কলকাতা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর রুহুল আমিন আলি শাহের বাড়িতেও পৌঁছান তদন্তকারীরা। রুহুল আমিন বর্তমানে রিজার্ভ ফোর্সে কর্মরত থাকলেও একসময় হেয়ার স্ট্রিট ও শেক্সপিয়র সরণি থানায় কর্মরত ছিলেন এবং তিনি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। এছাড়া ভবানীপুরে অতুল কাটারিয়ার বাড়ি এবং রয়েড স্ট্রিট ও মার্ক্যুইজ স্ট্রিটের একাধিক হোটেলেও তল্লাশি চালায় ইডি।

উপহারের ডায়েরি ও ‘শান্তনু স্যার’ রহস্য

তদন্তে উঠে এসেছে এক অবাক করা ‘উপহার সংস্কৃতি’। জয় এস কামদারের অফিস থেকে বাজেয়াপ্ত করা একটি ডায়েরিতে দেখা গেছে, প্রভাবশালী পুলিশ আধিকারিকদের নিয়মিত বহুমূল্য উপহার পাঠানো হত। সেখানে ‘শান্তনু স্যার’ বা ‘শান্তনুদা’ সম্বোধন করে একাধিক এন্ট্রি পাওয়া গেছে। ইডির দাবি অনুযায়ী, ডিজিটাল ডিভাইস থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। জয় কামদার নিজের ব্যবসার আড়ালে মূলত এই পুলিশ কর্তার মদতেই যাবতীয় বেআইনি কাজ পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিন্ডিকেটের কার্যপদ্ধতি: সফট টার্গেট যখন সাধারণ মানুষ

এই চক্রটি মূলত প্রবাসী বা প্রবীণ নাগরিকদের ‘সফট টার্গেট’ হিসেবে বেছে নিত। যেসব বয়স্ক মানুষের সম্পত্তি দেখভালের কেউ নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় ভুয়া মামলা দায়ের করা হত। এরপর ডিসিপি পদমর্যাদার আধিকারিকের প্রচ্ছন্ন মদতে তাঁদের থানায় ডেকে হেনস্তা করা হত। সেই সময় সোনা পাপ্পুর মতো অপরাধীরা সামনে এসে ভয় দেখিয়ে নামমাত্র দামে জমি বা বাড়ি লিখে দিতে বাধ্য করত। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কলকাতা পুরসভার একাংশ কাউন্সিলরেরও মদত ছিল বলে ইডি সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কোনো এলাকায় নির্মাণ কাজ শুরু করতে গেলে কাউন্সিলরদের মোটা অঙ্কের তোলা দিতে হত এবং তাঁদের অনুমোদিত সিন্ডিকেট থেকেই নির্মাণ সামগ্রী কেনা বাধ্যতামূলক ছিল।

প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

একজন ডিসিপি পদমর্যাদার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় কলকাতা পুলিশের ভাবমূর্তি বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। রুহুল আমিন আলি শাহের মতো আধিকারিকরা, যাঁরা একসময় পুলিশ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ছিলেন, তাঁদের এই চক্রে জড়িয়ে থাকা ইঙ্গিত দেয় যে দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে। ইডি এখন খতিয়ে দেখছে এই ‘পিপিপি’ মডেলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা কোটি কোটি টাকা কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই কালো টাকা হোটেল ব্যবসা বা রিয়েল এস্টেটে খাটানো হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও নজরদারি

এই তদন্তের পরবর্তী ধাপে আরও বেশ কয়েকজন পুলিশ আধিকারিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তলব করতে পারে ইডি। বাজেয়াপ্ত করা ডায়েরি এবং ডিজিটাল ডিভাইস থেকে প্রাপ্ত নামগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় সংস্থাটি এই প্রভাবশালী চক্রের প্রতিটি সদস্যকে আইনের আওতায় আনতে পারে কি না। আগামী দিনগুলোতে এই মামলার চার্জশিটে আর কার কার নাম যুক্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের খোয়া যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করা সম্ভব হয় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে রাজ্যবাসীর। প্রশাসনের অভ্যন্তরে শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে নাকি এই ‘ত্রিভুজ দুর্নীতি’ আরও ডালপালা মেলবে, তা সময়ই বলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *