টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিকের জন্মদিন মানেই ভক্ত এবং অনুরাগী মহলে একটা আলাদা উত্তেজনা। তবে এই বছরের জন্মদিনটি অভিনেতা এবং তাঁর পরিবারের কাছে ছিল কিছুটা অন্যরকম। রাজনীতির ব্যস্ততা, বিতর্ক আর প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে এসে কাঞ্চন মল্লিক এদিন ধরা দিলেন এক অন্য রূপে—নিছকই একজন অভিনেতা এবং স্নেহময় পিতা হিসেবে। তাঁর স্ত্রী শ্রীময়ী চট্টরাজ এবিপি লাইভ বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরলেন কাঞ্চনের জীবনের এই নতুন অধ্যায়ের কথা।
রাজনীতি নাকি অভিনয়: কাঞ্চনের জীবনের মোড়
গত পাঁচ বছর কাঞ্চন মল্লিকের জীবনের এক বড় সময় কেটেছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক হিসেবে। কিন্তু রাজনীতির কঠিন বাস্তব তাঁকে শিখিয়েছে যে, সব মানুষের স্বভাব সব কাজের জন্য উপযুক্ত নয়। শ্রীময়ী স্পষ্ট জানালেন, রাজনীতির জটিল অলিগলি কাঞ্চনের জন্য নয়। তিনি বলেন, ‘কাঞ্চন শুধু অভিনয়টুকুই পারে, রাজনীতি ওর দ্বারা সম্ভব নয়।’ গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এমনকি প্রচারের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার মতো অপমানজনক ঘটনার সাক্ষীও হতে হয়েছিল তাঁকে। সেই সময়কার মানসিক লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে শ্রীময়ী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কাঞ্চন যে শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করতে চেয়েছিলেন, সেটাই হয়তো রাজনীতির ময়দানে তাঁর ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবার ও ঘরোয়া উদযাপনের গল্প
এই বছরের জন্মদিনে কোনো রাজনৈতিক আড়ম্বর ছিল না, ছিল না কালীঘাটের মন্দিরে যাওয়ার তাড়াহুড়ো। কারণ একটাই—একরত্তি মেয়ে কৃষভির অসুস্থতা। গত দেড় মাস ধরে মেয়ে অসুস্থ থাকায় শ্রীময়ী এবং কাঞ্চন পুরো সময়টা বাড়িতেই কাটিয়েছেন। শ্রীময়ী জানালেন, ‘কৃষভিকে বাইরে বের করতে ভয় লাগছে, তাই বাড়িতেই যাবতীয় আয়োজন করা হয়েছে।’ কাঞ্চনের পছন্দের পাঁঠার মাংস, পায়েস এবং ঘরোয়া রান্নায় সেজে উঠেছিল দুপুরের খাবার। বাবা-মেয়ের খুনসুটি আর কেক কাটার আনন্দে ঘর ভরে উঠেছিল। বাইরের জাঁকজমকের চেয়ে এই ঘরোয়া মুহূর্তগুলোই তাঁদের কাছে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যতের পথে নতুন যাত্রা
রাজনীতি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত কাঞ্চন নিজেই নিয়েছিলেন। ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিনি সেই ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। শ্রীময়ীর কথায়, কাঞ্চন এখন আর রাজনীতিতে জড়াতে চান না। অভিনয়ই তাঁর আসল জায়গা, যেখানে তিনি সম্মান পেয়েছেন এবং যেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রাজনীতিতে এসে তিনি হয়তো নিজের উন্নতি করতে পারেননি, কিন্তু অভিনেতা হিসেবে যে ভালোবাসা তিনি দর্শকদের কাছ থেকে পেয়েছেন, সেটাই তাঁর জীবনের পরম প্রাপ্তি।
জীবনের প্রতিটি বাঁক আমাদের কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়। কাঞ্চন মল্লিকের এই যাত্রাপথ আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, খ্যাতির শিখরে পৌঁছানোর চেয়ে নিজের সত্তাকে বজায় রাখা অনেক বেশি জরুরি। রাজনীতির উত্তাল সমুদ্র থেকে ফিরে এসে নিজের প্রিয় অভিনয়ের আঙিনায় পুনরায় পা রাখাটা এক ধরণের সাহসের পরিচয়। দিনের শেষে, একজন মানুষ যখন তার নিজের কাজের জায়গায় ফিরে যায় এবং পরিবারের সাথে শান্তিতে সময় কাটায়, তখনই সে প্রকৃত সুখের সন্ধান পায়। কাঞ্চনের এই নতুন পথচলা হয়তো আমাদের শেখায় যে, ভুল পথে অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে সঠিক সময়ে নিজের ভুল বুঝতে পারা এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। এখন তিনি কেবলই একজন শিল্পী, যিনি নিজের কাজের মাধ্যমে দর্শকদের মুখে হাসি ফোটাতে চান, আর এই সহজ সরল জীবনবোধই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।