Headlines

সল্টলেক স্টেডিয়ামের বিতর্কিত ‘বিদঘুটে’ মূর্তি অপসারণ: নন্দনতত্ত্ব বনাম প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত

সল্টলেক স্টেডিয়ামের বিতর্কিত 'বিদঘুটে' মূর্তি অপসারণ: নন্দনতত্ত্ব বনাম প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত Photo by Noor Zaman on Pexels

সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান প্রবেশপথের সামনে স্থাপিত বিতর্কিত সেই ‘অদ্ভুত’ মূর্তিটি অবশেষে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রাজ্য ক্রীড়া দপ্তরের নির্দেশে এবং প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে এই কাঠামোটি ভেঙে ফেলা হয়। গত কয়েকদিন ধরেই এই মূর্তির নকশা নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও সমাজমাধ্যমে উপহাস চলছিল, যার প্রেক্ষিতে স্বয়ং ক্রীড়ামন্ত্রী এই স্থাপত্যটিকে ‘বিদঘুটে’ বলে অভিহিত করার পর এই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হল।

বিতর্কের মূলে যে নকশা ও প্রেক্ষাপট

যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সৌন্দর্য্যায়নের অংশ হিসেবে স্টেডিয়ামের ৫ নম্বর গেটের সামনে এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল। স্থাপত্যটিতে দেখা গিয়েছিল, নিচের অংশে মানুষের দুটি কাটা পা এবং তার উপরে স্থাপিত হয়েছে রাজ্য সরকারের লোগো ‘বিশ্ব বাংলা’। এই অদ্ভুত সমন্বয় সাধারণ মানুষের চোখে দৃষ্টিকটু ঠেকেছিল। বিশেষ করে মূর্তির উপরিভাগ না থাকায় এবং শুধুমাত্র পা দুটির উপর বিশাল লোগো বসানোয় এটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান ক্রীড়া ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত যুবভারতীর সামনে এমন একটি স্থাপত্য কেন রাখা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ডার্বি ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামে আসা হাজার হাজার ফুটবল অনুরাগী এই মূর্তির ছবি তুলে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করলে বিতর্কটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ মানুষই এই নকশাকে ‘নন্দনতত্ত্বের পরিপন্থী’ বলে বর্ণনা করেন।

ক্রীড়ামন্ত্রীর অসন্তোষ ও প্রশাসনিক সক্রিয়তা

এই বিতর্কের অবসান ঘটে যখন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক (বা সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধান) স্বয়ং মূর্তিটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ডার্বি ম্যাচের দিন স্টেডিয়াম পরিদর্শনে এসে তিনি এই মূর্তিটি দেখেন এবং সরাসরি একে ‘বিদঘুটে’ ও ‘অদ্ভুত’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি তখনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই স্থাপত্যটি সেখানে রাখা হবে না এবং এটি দ্রুত সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেবেন।

মন্ত্রীর এই বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রশাসনিক স্তরে তৎপরতা শুরু হয়। মঙ্গলবার সকালেই শ্রমিকরা হাতুড়ি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে মূর্তিটি ভাঙার কাজ শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মূর্তির উপরের ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোটি প্রথমে সতর্কতার সাথে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে নিচের সিমেন্টের তৈরি পা দুটি ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে সেই স্থানটি পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে।

জনমানসে প্রতিক্রিয়া ও শিল্পের মানদণ্ড

জনসাধারণের বড় একটি অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে, যুবভারতী স্টেডিয়ামের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া পরিকাঠামোর সামনে এমন কোনো শিল্পকর্ম থাকা উচিত যা রাজ্যের সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটায়। কোনো অসম্পূর্ণ বা অদ্ভুত নকশা স্টেডিয়ামের গাম্ভীর্য নষ্ট করে বলে অনেকের মত।

শিল্প সমালোচকদের মতে, জনসমক্ষে প্রদর্শিত কোনো শিল্প বা ‘পাবলিক আর্ট’ তৈরির সময় তার নান্দনিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন কোনো সরকারি লোগো ব্যবহার করা হয়, তখন তার উপস্থাপনা যেন মর্যাদাপূর্ণ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এই মূর্তির ক্ষেত্রে নকশাকার বা পরিকল্পনাকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল, তা নিয়ে ধন্দ থাকলেও জনসাধারণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি।

আর্থিক ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই মূর্তিটি তৈরি এবং স্থাপনে সরকারের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল। এখন তা ভেঙে ফেলার কারণে সেই অর্থের অপচয় নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে পরিকল্পনার অভাব কেন থাকবে, সেই প্রশ্নও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্টেডিয়ামের সামনের অংশটিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হবে।

যুবভারতী স্টেডিয়ামের সামনে ভবিষ্যতে কী ধরনের স্থাপত্য রাখা হবে, তা নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ক্রীড়া দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এবার কোনো স্থায়ী কাঠামো তৈরির আগে বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পীদের মতামত নেওয়া হতে পারে। ফুটবল বা বাংলার ক্রীড়া ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো প্রতিকৃতি সেখানে স্থান পেতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

আগামী দিনের ভাবনা

এই ঘটনাটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে নন্দনতাত্ত্বিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। কেবল সৌন্দর্য্যায়ন নয়, সেই সৌন্দর্য যেন সর্বজনগ্রাহ্য হয়, তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী কয়েক সপ্তাহে যুবভারতীর প্রবেশপথের এই শূন্য স্থানে কোনো নতুন নকশা বা ল্যান্ডস্কেপিং করা হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। স্টেডিয়ামের গরিমা রক্ষায় প্রশাসন আরও সর্তক পদক্ষেপ নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *