Headlines

সিএবি-তে লোঢা কমিটির নিয়ম লঙ্ঘন? ৭০ পেরিয়েও চেয়ারে অনড় সহ-সভাপতি নীতীশ রঞ্জন দত্ত

সিএবি-তে লোঢা কমিটির নিয়ম লঙ্ঘন? ৭০ পেরিয়েও চেয়ারে অনড় সহ-সভাপতি নীতীশ রঞ্জন দত্ত Photo by Noor Zaman on Pexels

ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (সিএবি)-তে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা এবং বিচারপতি লোঢা কমিটির সুপারিশ লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান সহ-সভাপতি নীতীশ রঞ্জন দত্ত, যিনি ময়দানে ‘অনু দত্ত’ নামেই সমধিক পরিচিত, ৭০ বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরেও প্রশাসনিক পদে বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই ঘটনাটি কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সের প্রশাসনিক অলিন্দে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, কারণ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কোনও ক্রিকেট সংস্থার পদাধিকারীর বয়স ৭০ বছরের বেশি হওয়া নিষিদ্ধ।

সংস্কারের ইতিহাস ও লোঢা কমিটির কঠোর নির্দেশিকা

ভারতীয় ক্রিকেটে স্বচ্ছতা ফেরাতে ২০১৩ সালের আইপিএল স্পট ফিক্সিং কাণ্ডের পর সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি লোঢা কমিটিকে দায়িত্ব দিয়েছিল। এই কমিটির দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এবং রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাগুলোর গঠনতন্ত্র আমূল বদলে ফেলা হয়। লোঢা কমিটির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, ৭০ বছর বয়স হয়ে গেলে কোনও ব্যক্তি আর কোনও ক্রিকেট সংস্থার প্রশাসনিক পদে থাকতে পারবেন না। এই নিয়মটি অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে রজার বিনির মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারকেও নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই বিসিসিআই সভাপতির পদ ছাড়তে হয়েছিল।

অনু দত্তর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন

সিএবি-র সংশোধিত ভোটার তালিকায় নীতীশ রঞ্জন দত্তর বয়স ৭০ বছর অতিক্রম করেছে বলে নথিভুক্ত রয়েছে। ভোটার কার্ড এবং সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথিতে তাঁর বয়স ৭০ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি কেন পদত্যাগ করেননি, তা নিয়ে সরব হয়েছেন সংস্থার একাংশ। তবে অনু দত্ত এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তাঁর নথিপত্রে বয়সের গরমিল রয়েছে। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমি জানি না এসআইআর-এ (SIR) আমার বয়স কীভাবে ৭০ হলো, সম্ভবত তারা গড়পড়তা একটি হিসাব ধরেছে।”

অনু দত্ত তাঁর সপক্ষে যুক্তি দিয়ে আরও জানান যে, তাঁর প্যান কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড এবং পাসপোর্টে জন্মতারিখ ২৬ জুন, ১৯৫৭ হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে। সেই নিরিখে তাঁর বয়স এখনও সত্তর ছোঁয়নি। তবে প্রশ্ন উঠছে, যদি নথিতে বয়সের ভুল থাকে, তবে তিনি তা আগে সংশোধন করার আবেদন কেন করেননি? এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর সিএবি-র এই প্রভাবশালী কর্তার কাছ থেকে মেলেনি।

মদন ঘোষের নজির ও প্রশাসনিক অস্বস্তি

সিএবি-তে বয়সের নিয়ম ভাঙার অভিযোগ শুধু অনু দত্তর বিরুদ্ধেই নয়, বরং যুগ্মসচিব মদন ঘোষের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছে। গত ২৩ মে মদন ঘোষ ৭০ বছর পূর্ণ করেছেন, কিন্তু তিনি এখনও ইস্তফা না দিয়ে নিজের পদে বহাল রয়েছেন। ইডেন গার্ডেন্সে তাঁর জন্য বরাদ্দ ঘরে তাঁর নেমপ্লেট এখনও জ্বলজ্বল করছে। প্রাক্তন ক্রিকেটার হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সিএবি-র প্রাক্তন কর্তারা।

প্রাক্তন কর্তাদের অবস্থান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

সিএবি-র প্রাক্তন যুগ্মসচিব বিশ্বরূপ দে এবং সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা লোঢা কমিটির সুপারিশ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমনকি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অভিষেক ডালমিয়া এবং স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিত্বরাও বাধ্যতামূলক ‘কুলিং অফ’ পিরিয়ড বা মেয়াদের নিয়ম মেনে চলেছেন। এই পরিস্থিতিতে অনু দত্ত বা মদন ঘোষদের মতো কর্তাদের পদ আঁকড়ে থাকা সিএবি-র অভ্যন্তরে বিভাজন স্পষ্ট করে দিচ্ছে। অনু দত্ত অবশ্য পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যে, অতীতেও অনেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দীর্ঘ সময় পদে ছিলেন, তখন কেন প্রশ্ন ওঠেনি?

ভবিষ্যতের প্রভাব ও সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ

এই বিতর্কের ফলে সিএবি-র প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদি প্রমাণিত হয় যে পদাধিকারীরা জেনেশুনে নিয়ম লঙ্ঘন করছেন, তবে বিসিসিআই হস্তক্ষেপ করতে পারে অথবা বিষয়টি পুনরায় আদালতের নজরে আনা হতে পারে। এটি কেবল ব্যক্তিগত পদ রক্ষার লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ক্রিকেট প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা।

আগামী দিনগুলোতে সিএবি-র বার্ষিক সাধারণ সভা বা কোনও বিশেষ সভায় এই বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রিকেট মহল এখন তাকিয়ে আছে সিএবি সভাপতি এবং বিসিসিআই-এর প্রতিক্রিয়ার দিকে। নথিপত্রের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত আইনি পথে যায় নাকি অভিযুক্ত কর্তারা স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *