ধনকুবের ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স-এর (SpaceX) প্রকাণ্ড ‘স্টারশিপ’ রকেট মে ২০২৬-এ টেক্সাসের স্টারবেস থেকে উৎক্ষেপণের পর ভারত মহাসাগরে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। ১২তম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শেষে রকেটটি সফলভাবে জল স্পর্শ (Splashdown) করলেও মুহূর্তের মধ্যেই এক বিশাল আগুনের গোলায় পরিণত হয়। এই বিস্ফোরণটি মূলত রকেটটির নির্ধারিত অবতরণের সময় ঘটে, যখন এটি উড্ডয়ন পর্বের জটিল ধাপগুলো সম্পন্ন করে পৃথিবীতে ফিরে আসছিল।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও স্টারশিপের গুরুত্ব
স্টারশিপ রকেটটি মূলত চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহে মানুষ ও ভারী সরঞ্জাম পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। নাসার (NASA) ‘আর্টেমিস’ (Artemis) অভিযানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই রকেটটির সফলতার ওপর নির্ভর করছে মার্কিন মহাকাশচারীদের পুনরায় চন্দ্রপৃষ্ঠে পদার্পণ। স্পেসএক্সের এই যানটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত, যা মহাকাশ গবেষণার খরচ কমিয়ে আনতে পুনঃব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
গত কয়েক বছর ধরে স্পেসএক্স তাদের স্টারশিপ প্রোটোটাইপ নিয়ে একাধিক পরীক্ষা চালিয়েছে। এবারের ১২তম উড্ডয়নটি ছিল পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। টেক্সাসের বোকা চিকা থেকে উৎক্ষেপণের পর রকেটটি মহাকাশে তার কার্যকারিতা প্রমাণের চেষ্টা করে। তবে ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি ছোঁয়ার ঠিক পরেই যে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তা বিজ্ঞানীদের আনন্দকে কিছুটা হলেও উদ্বেগে রূপান্তর করেছে।
উৎক্ষেপণ থেকে বিস্ফোরণ: ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
উড্ডয়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই রকেটটির গতিবিধি আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রকেটের বুস্টার বা উপরের অংশটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করার কোনো লক্ষ্য ছিল না। বরং একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে সাগরে নামানোর কথা ছিল। মহাকাশে অবস্থানকালে স্টারশিপ রকেটটি ২২টি ‘মক’ (Mock) স্যাটেলাইট সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপন করে। এই স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে দুটি রকেটটির অবতরণের দৃশ্য ভিডিও করার কাজও করছিল।
বিস্ফোরণের তীব্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও এবং স্পেসএক্সের লাইভ স্ট্রিমে দেখা যায়, রকেটটি সাগরে নামার পর এর পেছনের অংশে আগুন জ্বলছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রকেটটি একদিকে হেলে পড়ে এবং বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের ফলে তৈরি হওয়া আগুনের গোলাটি অনেকটা পারমাণবিক হামলার পর তৈরি হওয়া ছত্রাক আকৃতির মেঘের মতো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র তাপে সমুদ্রের জলরাশি উত্তাল হয়ে ওঠে এবং প্রকাণ্ড রকেটটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা
স্পেসএক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের উড্ডয়নটি পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। রকেটটি উৎক্ষেপণের শুরুতেই একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়, যার ফলে এটি নির্ধারিত কক্ষপথের পরিবর্তে ভিন্ন একটি পথে চলতে শুরু করে। এছাড়া আপার স্টেজ বা উপরের অংশটি বুস্টার থেকে আলাদা হওয়ার সময়ও যান্ত্রিক জটিলতা দেখা দেয়। বুস্টারটিকে মেক্সিকো উপসাগরে নিয়ন্ত্রিতভাবে নামানোর পরিকল্পনা থাকলেও সেটি শেষ পর্যন্ত অনিয়ন্ত্রিতভাবে আছড়ে পড়ে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় স্টারশিপকে প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে হয়। এই সময় মহাকাশযানটিকে নির্দিষ্ট কোণে হেলিয়ে রাখতে হয় এবং ইঞ্জিনগুলো পুনরায় চালু করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইঞ্জিন পুনরায় চালু করার সময় জ্বালানি সরবরাহ বা চাপের অসামঞ্জস্যতার কারণে এই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে স্পেসএক্সের দাবি, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি এবং তারা এই পরীক্ষা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত ও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা
নাসার আর্টেমিস অভিযানের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে পুনরায় চাঁদের মাটিতে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পেসএক্সের এই স্টারশিপই সেই অভিযানের প্রধান বাহন। অন্যদিকে, চীন ২০৩০ সালের মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। জেফ বেজোসের সংস্থা ‘ব্লু অরিজিন’ (Blue Origin)-ও পাল্লা দিয়ে তৈরি করছে তাদের নিজস্ব চন্দ্রযান প্রযুক্তি।
মহাকাশ গবেষণা বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই তীব্র প্রতিযোগিতার ফলে গুণমান ও নিরাপত্তার বিষয়টি কিছুটা অবহেলিত হচ্ছে। তাদের মতে, কেবল দ্রুত পৌঁছানোর লক্ষ্য না রেখে প্রতিটি যান্ত্রিক ত্রুটিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ভারত মহাসাগরের এই বিস্ফোরণ প্রমাণ করে যে, অতি-ভারী রকেট প্রযুক্তিতে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বিস্ফোরণ সত্ত্বেও স্পেসএক্স এই অভিযানকে ব্যর্থ বলতে নারাজ। ইলন মাস্কের মতে, প্রতিটি পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য পরবর্তী উড্ডয়নকে আরও নিখুঁত করবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তারা আরও একটি স্টারশিপ প্রোটোটাইপ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবারের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে কীভাবে ল্যান্ডিং বা অবতরণ প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করা যায়, সেটিই হবে বিজ্ঞানীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পরবর্তী কয়েক বছর মহাকাশ বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পেসএক্সের পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে যদি অবতরণ সফল না হয়, তবে নাসার আর্টেমিস অভিযানের সময়সীমা পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত মহাসাগরের এই আগুনের গোলা কেবল একটি রকেটের ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং এটি মহাকাশ জয়ের পথে বিদ্যমান কঠিন বাস্তবতার এক বিশাল স্মারক। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে স্পেসএক্সের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যেখানে নিরাপত্তার সাথে গতির সমন্বয় ঘটানোই হবে মূল লক্ষ্য।