নব্বইয়ের দশকের সেই আইকনিক সুপারহিরো ‘শক্তিমান’ বা মুকেশ খান্নাকে চেনেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। ছোটবেলার সেই স্মৃতি আজও অনেকের মনে অম্লান। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের সেই শিক্ষা আজও আমাদের অনেকেরই প্রেরণা। কিন্তু সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলেছে। দীর্ঘ অভিনয় জীবন পার করে আজ মুকেশ খান্নার বয়স ৬৭। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে রয়ে গিয়েছেন চিরকুমার। বিয়ে নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই একটু ভিন্ন এবং কিছুটা দার্শনিক। সম্প্রতি তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে—তবে কি এবার বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন তিনি?
বিয়ের প্রতি মুকেশ খান্নার গভীর আস্থা
অনেকেই মনে করেন মুকেশ খান্না হয়তো বিয়েতে বিশ্বাস করেন না, তাই তিনি একা। কিন্তু সত্যটি সম্পূর্ণ বিপরীত। অভিনেতা নিজে জানিয়েছেন, তিনি বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটির প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তাঁর মতে, বিয়ে মানে কেবল আইনি চুক্তি নয়, এটি দুটি আত্মার মিলন। আধুনিক সম্পর্কের সমীকরণে যেখানে বিচ্ছেদ বা পরকীয়া খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে মুকেশ খান্না বিয়ের পবিত্রতাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, বিয়ে কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে এবং এটি একটি আধ্যাত্মিক বন্ধন।
পৌরুষত্ব ও সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মুকেশ খান্না স্মরণ করেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রবি চোপড়ার কথা। একসময় রবি চোপড়া তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, অনেক নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা কখনোই একজন পুরুষের পৌরুষত্বের প্রমাণ হতে পারে না। এই শিক্ষাটি মুকেশ খান্না তাঁর জীবনে গভীরভাবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর কথায়, তিনি কখনোই মনে করেননি যে নারীসঙ্গের আধিক্যই পৌরুষের পরিচয়। বরং নিজের নীতি ও আদর্শে অটল থাকাই প্রকৃত শক্তি। বন্ধুদের আড্ডায় যেখানে অনেকেই সম্পর্কের বেড়াজালে জড়িয়েছেন, সেখানে তিনি নিজের একা থাকাকেই বেছে নিয়েছেন, কোনো অবান্তর বিতর্কে জড়াতে চাননি।
স্ত্রীভক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা
সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, নারীদের স্বামীভক্ত হওয়া উচিত। কিন্তু মুকেশ খান্না এখানে এক ভিন্ন সুর তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পুরুষদের কেন স্ত্রীভক্ত হওয়া উচিত নয়? তাঁর মতে, দাম্পত্য জীবনে কেবল স্ত্রীকেই কেন সব ত্যাগ করতে হবে? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধার। বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা করে বিবাহিত জীবনকে কলঙ্কিত করার ঘোর বিরোধী তিনি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, যদি কেউ বিয়ে করে, তবে তাকে সেই সম্পর্কের প্রতি শতভাগ সৎ থাকতে হবে। প্রতারণা করে সঙ্গীর প্রতি অবিচার করার চেয়ে একা থাকা অনেক ভালো।
পূর্বজন্ম ও কর্মফলের তত্ত্ব
মুকেশ খান্নার বিবাহিত জীবন নিয়ে দর্শনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আধ্যাত্মিকতা। তিনি মনে করেন, স্ত্রী কোনো সাধারণ পাওয়া নয়। আগের জন্মের পুণ্যফল সঞ্চয় করলে তবেই একজন যোগ্য জীবনসঙ্গী পাওয়া যায়। তাঁর মতে, সম্পর্ক জীবনে অনেক আসতে পারে, কিন্তু ‘স্ত্রী’ একজনই হয় এবং সেই সম্পর্ক পূর্বজন্ম থেকেই নির্ধারিত থাকে। এই গভীর বিশ্বাসই তাঁকে আজীবন অবিবাহিত রেখেছে। তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করে বা লোক দেখানো বিয়েতে বিশ্বাসী নন। তাঁর এই চিন্তাগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি সম্পর্কের গভীরতা এবং পবিত্রতা কতটা গুরুত্ব দেন।
আজকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে যেখানে সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেখানে মুকেশ খান্নার এই সনাতন ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি এক নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। ৬৭ বছর বয়সেও তিনি যেভাবে নিজের আদর্শ এবং বিশ্বাসের ওপর অটল রয়েছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি নিজের শর্তে জীবন অতিবাহিত করছেন এবং বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেবল সামাজিক রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে আত্মার বন্ধন হিসেবে দেখছেন। মানুষ কেবল সঙ্গীর খোঁজে নয়, বরং জীবনের পূর্ণতা খোঁজে—মুকেশ খান্নার এই জীবনদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের সম্পর্কের জন্য ধৈর্য এবং ভাগ্যের ওপর আস্থা রাখা কতটা জরুরি।