তীব্র দাবদাহে হাঁসফাঁস করা জনজীবন স্বস্তি পেতে বাইরের প্রচণ্ড গরম থেকে সরাসরি এসির ঠাণ্ডা ঘরে ঢুকে পড়ছেন অনেকেই। চিকিৎসকদের মতে, বাইরের উচ্চ তাপমাত্রা থেকে হঠাৎ করে এসির শীতল পরিবেশে প্রবেশ করলে শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ‘থার্মাল শক’ বা হিট শকের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই অভ্যাসটি দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের ঝুঁকি
মানবদেহ একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত। যখন কেউ বাইরে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় থাকেন, তখন শরীরের রক্তনালীগুলো প্রসারিত থাকে এবং ঘামের মাধ্যমে শরীর নিজেকে শীতল রাখে। হঠাৎ করে ১৬-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এসিতে ঢুকলে রক্তনালীগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়, যা রক্তচাপের ওপর হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করে।
এই প্রক্রিয়াটি বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হঠাৎ রক্তচাপের পরিবর্তন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। এছাড়া, এই অভ্যাসের ফলে পেশির খিঁচুনি বা ‘মাসল ক্র্যাম্প’-এর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
শ্বাসতন্ত্র ও অ্যালার্জির সমস্যা
এসির বাতাস অত্যন্ত শুষ্ক হওয়ায় এটি শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। বাইরে থেকে এসিতে ঢোকার ফলে নাক ও গলার মিউকাস মেমব্রেন শুকিয়ে যায়, যা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের পথ সহজ করে দেয়। নিয়মিত এই অভ্যাস করলে সাইনোসাইটিস, অ্যালার্জি এবং দীর্ঘস্থায়ী কাশির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করলে তাতে জমে থাকা ধুলিকণা ও ফাঙ্গাস শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনে। এসির বাতাস সরাসরি শরীরে লাগলে তা হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসের উপসর্গ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সতর্কতা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাইরের গরম থেকে ফিরে অন্তত ২০-৩০ মিনিট সাধারণ তাপমাত্রার ফ্যানের নিচে বিশ্রাম নেওয়া উচিত। শরীরের ঘাম পুরোপুরি শুকিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পরই এসির ঘরে প্রবেশ করা নিরাপদ। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে না রাখাই শরীরের জন্য আদর্শ।
এসি ব্যবহারের পাশাপাশি আর্দ্রতা বজায় রাখতে ঘরে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় এসিতে থাকলে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা প্রয়োজন, যাতে শরীর হাইড্রেটেড থাকে। এছাড়া এসির ফিল্টার মাসে অন্তত একবার পরিষ্কার করা জরুরি।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও করণীয়
আগামী দিনগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, ফলে এসির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সচেতনতা না বাড়লে হিট স্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামীতে এসির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে আরও ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে। জনসাধারণকে এখন থেকেই অভ্যাস পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে, যেন প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে নিজের শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি না হয়।