কলকাতা পুরসভায় এক নজিরবিহীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন বিজেপি কাউন্সিলর তথা বিধায়ক সজল ঘোষ। মঙ্গলবার পুরসভার অধিবেশন কক্ষের পরিবর্তে কাউন্সিলরস ক্লাব রুমে তৃণমূল কাউন্সিলরদের বৈঠককে ‘বেআইনি’ এবং ‘গণতন্ত্রের প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। সজল ঘোষের দাবি, বিরোধী শূন্য করে এবং পুরসভার সমস্ত নিয়মাবলী ও প্রোটোকল লঙ্ঘন করে এই বৈঠক পরিচালনা করা হয়েছে, যা কলকাতা পুরসভার দীর্ঘ ঐতিহ্যের পরিপন্থী।
ঐতিহ্যের অবমাননা ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
কলকাতা পুরসভা ভারতের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো মনীষীরা এই পুরসভার মেয়র পদ অলঙ্কৃত করেছেন। সজল ঘোষের মতে, বর্তমান শাসকদল এই ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করে পুরসভাকে ‘পার্টি অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
সাধারণত, পুরসভার অধিবেশন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে, কমিশনার ও সচিবের উপস্থিতিতে এবং সমস্ত দলের কাউন্সিলরদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। সজল ঘোষ অভিযোগ করেন যে, কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই নির্ধারিত হাউস বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানা যায় যে, তৃণমূল কাউন্সিলররা ক্লাব রুমে একটি সমান্তরাল অধিবেশন বসিয়েছেন।
নিয়ম লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ
বিজেপি বিধায়ক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে, এই কথিত অধিবেশনে হাউসের কোনো নিয়ম মানা হয়নি। তিনি বলেন, “হাউসের কতগুলি রুল আছে। কমিশনার ও সেক্রেটারির অনুমতি নিয়ে হাউস করতে হয়। আমি জানি না সেটা ছিল কি না। বিরোধীরা কেউ কোনো খবরই পেল না—বিজেপি তো বটেই, সিপিএম বা বামপন্থীরাও অন্ধকারে ছিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই অধিবেশনে বক্তব্য রেকর্ড করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী অধিবেশনের শেষে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বাধ্যতামূলক, যা এদিন পালন করা হয়নি বলে তাঁর দাবি। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট রাজ্য সঙ্গীতও গাওয়া হয়নি বলে তিনি কটাক্ষ করেন। তাঁর মতে, এটি মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ‘বৈঠকখানা’ নয় যে যা খুশি তাই করা যাবে।
রাজনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনি ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছেন সজল ঘোষ। তিনি জানান, কাউন্সিলরদের যে সমস্ত প্রশ্ন ছিল তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং উপস্থিতির কোনো রেকর্ড রাখা হয়নি। তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান কাউন্সিলর মীনাদেবী পুরোহিত, যিনি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুরসভার সাথে যুক্ত। সজল ঘোষের দাবি, মীনাদেবীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাতেও এমন অবৈধ ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
সজল ঘোষের হুঙ্কার, “আমরা কমিশনারের কাছে যাব এবং আবেদন করব যাতে এই বেআইনি কাজের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রয়োজনে এই পুর বোর্ড ভেঙে দেওয়া হোক, তাতেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই।” তিনি আরও যোগ করেন যে, কমিশনারের উপস্থিতিতেই যদি এই ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং এর জবাবদিহি করতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও পর্যবেক্ষণের দিক
এই সংঘাতের ফলে আগামী দিনগুলোতে কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক কাজকর্মে বড় ধরনের স্থবিরতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কমিশনার এই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেন কি না, অথবা রাজ্য নগরোন্নয়ন দপ্তর এই বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। বিরোধীরা যদি রাজপথে বা আদালতে এই আন্দোলনের মাত্রা বাড়ায়, তবে পুরবোর্ডের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
আসন্ন দিনগুলোতে পুরসভার পরবর্তী অধিবেশনে বিরোধীদের ভূমিকা এবং শাসকদলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের পাল্টা কোনো আইনি ব্যাখ্যা আসে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। এই বিতর্ক কেবল কলকাতা পুরসভার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজ্য রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।