নির্বাচন কমিশনের ‘ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ বুধবার এক রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে সংবিধানের ৩২৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে আদালত একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাওয়া নয়।
প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই
২০২৫ সালের জুন মাসে বিহারে আয়োজিত এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কংগ্রেস, আরজেডি, সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। তাদের মূল অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করছে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মতো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। দীর্ঘ শুনানির পর বুধবার আদালত এই সংক্রান্ত সমস্ত আবেদন খারিজ করে দেয় এবং নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপকে আইনসিদ্ধ বলে গণ্য করে।
ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার
আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রধান ভিত্তি। নির্বাচন কমিশন জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর আওতায় ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় নথি নির্ধারণ করতে পারে। বিহারের ক্ষেত্রে ১১টি নথি এবং পরবর্তীতে আধার কার্ডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার যে সিদ্ধান্ত কমিশন নিয়েছিল, তা আদালতের নজরে আইনগতভাবে সঠিক। কমিশন ভোটারদের তালিকাভুক্ত করার জন্য যে কোনো যৌক্তিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারে, যা অবাধ নির্বাচনের পথে সহায়ক।
নাগরিকত্ব ও কমিশনের সীমাবদ্ধতা
রায়দানের সময় সুপ্রিম কোর্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এনেছে তা হলো নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান। আদালত স্পষ্ট করেছে, নির্বাচন কমিশন কেবল ভোটার তালিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে সেই ব্যক্তিকে ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কমিশনের নেই। এই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়, যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বা বিদেশমন্ত্রকের।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। এরপর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানির মাধ্যমে কেন্দ্র সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। যদি সরকার কাউকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে নির্বাচন কমিশনকে সেই নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই যে কেউ নাগরিক নন—এই ধারণাটি আদালত সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
এই রায়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশজুড়ে চলা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় এক নতুন আইনি দিশা পাওয়া গেল। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় সরকার এই বাদ পড়া নামগুলোর বিষয়ে কত দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করে এবং ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে নির্বাচন কমিশন পরবর্তী পদক্ষেপে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখে। আসন্ন লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।